প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ফরিদপুর: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, পদ্মাপাড়ের জেলা ফরিদপুরের রাজনীতিতে ততই নতুন নতুন সমীকরণ যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর, চরভদ্রাসন) আসনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী জট ভোটের লড়াইকে এক রহস্যময় মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ১৯০০ সালের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৬-এর এই ঐতিহাসিক নির্বাচন পর্যন্ত ফরিদপুরের রাজনীতিতে এটি সম্ভবত সবচেয়ে বড় বাঁক বদল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ফরিদপুর সবসময়ই একটি ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে পরিচিত। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের সময় থেকেই এ অঞ্চলের নেতারা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর ছিল বিপ্লবের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত এ আসনটি মূলত আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী ঘরানার স্বতন্ত্র প্রার্থীর দখলে ছিল। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া যে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, তা আজ ২০২৬ সালে এসে ইনসাফ কায়েম ও টেকসই সুশাসনের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে।
আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত এ আসনে এবার আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই। এই সুযোগে বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাবুল কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী নেতাদের দলে ভিড়িয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছেন। এলাকায় চাউর রয়েছে, নিক্সন চৌধুরী ও কাজী জাফর উল্যাহর একনিষ্ঠ অনুসারীদের অনেকে গ্রেফতার বা মামলা এড়াতে এখন প্রকাশ্যে ধানের শীষের প্রচার চালাচ্ছেন।
ভোটের লড়াইয়ে যারা আছেন: এ আসনে স্বতন্ত্রসহ মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখযোগ্যরা হলেন:
শহিদুল ইসলাম বাবুল (বিএনপি, ধানের শীষ): ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত, ১২৮ বার জেল খেটেছেন।
এ এ এম মুজাহিদ বেগ (স্বতন্ত্র, ফুটবল): সমাজসেবক এবং চরভদ্রাসনের বিখ্যাত বেগ পরিবারের সন্তান।
মিজানুর রহমান মোল্যা (খেলাফত মজলিস, রিকশা): সামাজিক কর্মকাণ্ডে পরিচিতি রয়েছে তার।
মো. সরোয়ার হোসেন (জামায়াতে ইসলামী, দাঁড়িপাল্লা): ১১-দলীয় জোটের অমীমাংসিত প্রার্থীর জটিলতায় তার ভূমিকা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলাকার সচেতন ভোটারদের মতে, ১১-দলীয় জোট যদি শেষ পর্যন্ত জামায়াত বা খেলাফত মজলিসের মধ্যে একজনকে একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে পারে, তবে হিসাব পাল্টে যাবে। অন্যথায়, বিএনপির শহিদুল ইসলাম বাবুল, খেলাফত মজলিসের মিজানুর রহমান মোল্যা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগের মধ্যে এক তীব্র ত্রিমুখী লড়াই হবে।
রাজনৈতিক পালাবদলের এই সন্ধিক্ষণে নেতাদের কণ্ঠেও ঝরছে ইতিহাসের সুর:
১৯৭১: "এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" — বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
২০০২ (উপ-নির্বাচন): "ফরিদপুর-৪ এর মাটি বিএনপির ঘাঁটি।" — তৎকালীন বিএনপি নেতাদের স্লোগান (যখন এ আসনে বিএনপি জিতেছিল)।
২০২৬ (৫ ফেব্রুয়ারি): "আমি ১২৮ বার জেলে গিয়েছি নিজের জন্য নয়, দেশের মানুষের ভোটের অধিকারের জন্য।" — শহিদুল ইসলাম বাবুল।
১৯০০ সাল থেকে যে জনপদ ব্রিটিশদের শাসন দেখেছে, যারা ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই ফরিদপুর-৪ এর ভোটাররা এবার এক ভিন্ন লড়াইয়ের সাক্ষী। আওয়ামী লীগের ‘রিজার্ভ ভোট’ এবার বড় ফ্যাক্টর। এই ভোটগুলো যারা নিজেদের ঝুলিতে টানতে পারবেন, তিনিই শেষ হাসি হাসবেন। ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ তার ক্লিন ইমেজের কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন, যা বড় দলগুলোর প্রার্থীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ, বাসস এবং স্থানীয় নির্বাচনী পর্যালোচনা ২০২৬।
বিশ্লেষণ: এই প্রতিবেদনে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের ১২৬ বছরের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে যুক্ত করা হয়েছে। ফরিদপুর-৪ আসনের এই নির্বাচন প্রমাণ করছে যে, রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে বর্তমানে কৌশল ও সামাজিক ইমেজই জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |