এভারকেয়ারে নিবিড় পর্যবেক্ষণে খালেদা জিয়া: ফেসবুকে ফখরুলের আবেগঘন বার্তা, প্রার্থনায় দেশ
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে আইসোলেটেড কেবিনে রেখে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন চিকিৎসকরা। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা বলছেন, অন্তত পরবর্তী ১২–২৪ ঘণ্টা তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোববার (২৩ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’ থেকে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর মেডিকেল বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিবায়োটিকসহ জরুরি চিকিৎসা শুরু করে।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে লেখা, “সেরে উঠুন দেশনেত্রী, আপনার প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ”—যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
দলের ভেতরে–বাইরে অনেকেই এই বার্তাকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতি শুভকামনা হিসেবে দেখছেন না; বরং ৭৯ বছর বয়সী বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সুস্থতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বরাত দিয়ে বিএনপির মিডিয়া সেল সদস্য শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমকে জানান, খালেদা জিয়ার শ্বাসকষ্টের সঙ্গে নতুন করে বুকে সংক্রমণ দেখা গেছে, যা তার আগে থেকেই জটিল হৃদ্রোগের সঙ্গে মিলে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
মেডিকেল বোর্ডের আরেক সদস্য কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন,
খালেদা জিয়ার বুকে ইনফেকশন হয়েছে,
আগে থেকেই তার হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা ও স্থায়ী পেসমেকার রয়েছে,
এই অবস্থায় বুকে সংক্রমণ একযোগে হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসকে প্রভাবিত করছে,
সে কারণেই তাকে দ্রুত হাসপাতালে এনে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, ভর্তি হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে বেশ কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়েছে; আরও কিছু পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষা চলছে। বোর্ড একটি প্রোটোকল অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, কার্ডিয়াক সাপোর্ট ও অন্যান্য ওষুধ দিচ্ছে এবং অবস্থা অনুযায়ী প্রতি ১২ ঘণ্টা পর পর চিকিৎসা পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন করে নেওয়া বেশ কিছু পরীক্ষায় তার ফুসফুসের ইনফেকশনকে ‘পিউমোনিয়া’–জাতীয় সংক্রমণ হিসেবে সন্দেহ করছেন চিকিৎসকরা; পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে তাকে সিসিইউ বা আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ইউনিটে নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বোর্ডের সদস্যরা।
ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, চেয়ারপারসন দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন, যেন মহান আল্লাহ তাকে দ্রুত সুস্থ করে তোলেন। বিএনপির মিডিয়া সেল সদস্য শায়রুল কবির খানও জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই চিকিৎসা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তিনি ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন; একই সঙ্গে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে সারা দেশে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হচ্ছে।
দলের বিভিন্ন সূত্র জানায়, লন্ডনে থাকা তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান নিয়মিতভাবে চিকিৎসা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন; ঢাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে রয়েছেন প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শারমিলা রহমানসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়।
বছরের শুরুতে স্বাস্থ্যগত জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। সেখানে প্রথমে দ্য লন্ডন ক্লিনিকে ভর্তি থাকেন; পরবর্তী সময়ে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলতে থাকে। ১১৭ দিন সেখানে থাকার পর ৬ মে সকালে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় ফেরেন তিনি।
ফিরে আসার পর থেকে গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’–তেই তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। এভারকেয়ার হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক শহাবুদ্দীন তালুকদারের নেতৃত্বে গঠিত মেডিকেল বোর্ড নিয়মিতভাবে বাসায় গিয়ে তার ফলো–আপ করছিলেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হতো। অক্টোবরেও একবার তিনি এভারকেয়ারে ভর্তি হয়ে পরীক্ষার পরদিন বাসায় ফেরেন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী,
তিনি দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, ফুসফুসের সমস্যা, লিভার রোগ, হৃদ্রোগ ও চোখের বিভিন্ন রোগে ভুগছেন;
তার হৃদ্যন্ত্রে স্থায়ী পেসমেকার রয়েছে এবং আগে একাধিকবার স্টেন্ট বসানো হয়েছে;
এসব দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সঙ্গে নতুন সংক্রমণ মিলে প্রতি কয়েক মাস পর পর তার অবস্থা জটিল হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি, এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার খালাস এবং নির্বাচন অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি—সব মিলিয়ে ২০২৫ সালজুড়েই তিনি ছিলেন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
লন্ডনে চিকিৎসা চলাকালে এবং দেশে ফেরার পর বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি দ্রুত নির্বাচন আয়োজন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার ও গণআন্দোলনের অর্জন সুসংহত করার কথা তুলে ধরেছেন বলে আন্তর্জাতিক ও দেশি গণমাধ্যম উল্লেখ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে তার আকস্মিক অসুস্থতা বিএনপি রাজনীতিতে যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তেমনি নির্বাচন ঘিরে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে—
তিনি শারীরিকভাবে কতটা সুস্থ হয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবেন,
বিএনপির নেতৃত্ব দলীয় চেয়ারপারসনের অসুস্থতার মধ্যেও সংগঠনকে কতটা সুসংহত রাখতে পারবে,
অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে রাজনৈতিক সংলাপ ও নির্বাচন আয়োজনের যে চাপ ছিল, তা এখন কোন দিকে মোড় নেবে—
এই প্রশ্নগুলো এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, ১৯৮০–এর দশকের সামরিক শাসন–পরবর্তী গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। তার অসুস্থতা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীর শারীরিক সংকট নয়; বরং বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির এক পুরো অধ্যায়ের অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে—এমন মন্তব্য করছেন অনেকে।
মির্জা ফখরুলের ফেসবুক ফটোকার্ডে লেখা “আপনার প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ”—এই বাক্যটি তাই বাস্তবে শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের অনুভূতি নয়; দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অনিশ্চিত নির্বাচন ও গণতন্ত্রপথে ফেরার স্বপ্ন দেখানো এক বড় অংশের নাগরিক মনোভাবেরও প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে নানা আলোচনায়।
চিকিৎসকরা আপাতত আশাবাদী থাকলেও সতর্ক। তারা বলছেন, সবশেষ চিকিৎসা প্রোটোকল অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে; এখন শুধু অপেক্ষা—ওষুধ ও চিকিৎসায় তার দেহ কতটা সাড়া দেয়, এবং আগামি ১২–২৪ ঘণ্টায় অবস্থার কী পরিবর্তন হয়, সেটির জন্য।
১. দৈনিক প্রথম আলো (ইংরেজি সংস্করণ) ও অন্যান্য জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন – এভারকেয়ার হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার ভর্তি হওয়া, ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রে ইনফেকশন এবং ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয়ে বিস্তারিত।
২. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, ডেইলি সান, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ একাধিক দৈনিক – মেডিকেল বোর্ডের মন্তব্য, জরুরি পরীক্ষা–নিরীক্ষা, অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা, দেশবাসীর কাছে দোয়া চাওয়ার আহ্বান এবং শায়রুল কবির খান ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের উদ্ধৃতি।
৩. আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টাল (এপি, আল জাজিরা, ডেইলি স্টার, জাগো নিউজ, দ্য ট্রিবিউন ইন্ডিয়া, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইত্যাদি) – ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে যাওয়া, ৬ মে দেশে ফেরা, ১১৭ দিন চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা এবং নির্বাচন–পূর্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও খালেদা জিয়ার আইনগত অবস্থান–সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |