রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট: সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় সংকট সৃষ্টি
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এই মুহূর্তে এক অমানবিক সংকটের মুখোমুখি। মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএআইডি (USAID) এবং ইউরোপীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অনুদান কমে যাওয়ার ফলে তাদের প্রতি আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তাদের খাদ্য বরাদ্দ অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে, যা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গার জন্য এক নতুন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।
কক্সবাজার শিবিরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, এইভাবে আকস্মিক সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় পৃথিবীর বৃহত্তম শরণার্থী শিবির রয়েছে, যেখানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে এসে তারা এই শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু এখন তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং মৌলিক সহায়তার সংকট গভীর হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, একদিকে সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়া এবং অন্যদিকে শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়ায়, তাদের জন্য খাদ্য বরাদ্দ অর্ধেক করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত মানুষের মধ্যে খাদ্য সংকট আরও তীব্র হবে, যার প্রভাব পড়ে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উদ্বেগের কারণ
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, শরণার্থীরা নিজেরা জানেন না যে সহায়তা বন্ধ হলে তারা কোথায় যাবে। শরণার্থী শিবিরে অনেকেই উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে মায়েরা, যারা তাদের শিশুসন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। এক নারী রোহিঙ্গা শরণার্থী মাজুনা খাতুন, যিনি তার ছয় মাসের শিশুকে নিয়ে শিবিরে বসে ছিলেন, জানান, ‘‘সহায়তা বন্ধ হলে আমরা কোথায় যাবো? আমার শিশুর জীবন নিয়ে আমি এখন দুশ্চিন্তা করছি।’’
এ পরিস্থিতি শরণার্থী শিবিরে থাকা লাখ লাখ রোহিঙ্গার জন্য এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সৃষ্টি করেছে। তাদের পক্ষে একসময় নিজ দেশে ফিরতে কোনো উপায় নেই, এবং আশ্রয়ের দেশ বাংলাদেশও তাদের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
শরণার্থী শিবিরে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবা সংকট
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থী শিবিরে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবা সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে পারে। শিবিরের মানুষের চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সাহায্য না পেলে তাদের মধ্যে হতাশা এবং অপরাধের ঘটনা বাড়তে পারে। কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী জানিয়েছেন, বর্তমানে শিবিরে চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। ২৪ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ সাদেক বলেন, ‘‘ক্যাম্পে চিকিৎসকের সংখ্যা একদমই কম। আগে স্বেচ্ছাসেবকরা সহায়তা করতো, এখন তারা সবাই বরখাস্ত।’’
এভাবে, শরণার্থী শিবিরে থাকার শর্ত আরও কষ্টকর হয়ে উঠছে এবং রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ও অর্থায়ন সংকট
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রদান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় সাহায্য করেছে। তবে, মার্কিন সরকার এবং অন্যান্য দাতা দেশগুলোর সহায়তা বন্ধ বা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ‘‘তহবিল স্থগিত হওয়ার কারণে মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত পাঁচটি হাসপাতাল তাদের পরিষেবা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।’’
স্বাস্থ্যসেবা সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শরণার্থী
কক্সবাজারের স্বাস্থ্যসেবা তদারককারী প্রতিষ্ঠান ইন্টার-সেক্টর কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের প্রধান সমন্বয়কারী ডেভিড বাগডেন জানিয়েছেন, ‘‘স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবায় ব্যাঘাতের কারণে প্রায় ৩ লাখ শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’’ স্বাস্থ্য খাতে এই সংকটের ফলে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে মায়েদের জন্য, যারা শিশুসন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত।
এদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে, বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের সহায়তার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে, বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলি আরও সহায়তার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে। তারা আশা করছে, বিশ্বের দাতা দেশগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তার জন্য আরও বেশি অর্থায়ন করবে, যাতে শরণার্থী শিবিরে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। তবে, এ সময়ের মধ্যে সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এই অবস্থা যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তাহলে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে, যা তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে একটি বড় হুমকি।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |