ইসলামী আন্দোলনের ‘একলা চলো’ নীতি: আদর্শিক লড়াই নাকি রাজনৈতিক কৌশল?
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট গঠন এবং আদর্শিক সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, এমনকি ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক উত্তরণ—প্রতিটি ধাপেই জোটবদ্ধ রাজনীতির জয়গান শোনা গেছে। তবে ২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে লড়াই করার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে ইসলামী রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি, ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সাফ জানিয়ে দেন, তারা ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে নির্বাচনে যাচ্ছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, "আমরা যে নীতি-আদর্শকে ঘিরে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নেমেছিলাম, এখন সেই নীতি-অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের আগেই যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে যাচ্ছে, কাজেই প্রশ্ন উঠছে এটি ইলেকশন হবে নাকি সিলেকশন।" তিনি আরও ঘোষণা করেন, ইসলামী আন্দোলনের ২৬৮ জন প্রার্থীর কেউই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না এবং তারা এককভাবেই ভোটের মাঠে লড়াই করবেন।
ইসলামী আন্দোলনের এই ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, "জামায়াত আদর্শচ্যুত হয়নি এবং কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করা হয়নি। আমরা সম্মিলিতভাবেই এগিয়ে চলার একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলাম।" তিনি আরও জানান, জোটভুক্ত বাকি ১০ দলের মধ্যে ইতিমধ্যে ২৫৩টি আসনের বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪৭টি আসন এবং ইসলামী আন্দোলনের বিষয়ে জোটের লিয়াজোঁ কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বাংলার রাজনৈতিক সংগ্রাম ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের সময় থেকেই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক সংঘাত লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-র দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সব দল এক টেবিলে বসলেও নির্বাচনের সময় বারবার মেরুকরণ বদলেছে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৫ সাল জুড়ে চলা সংস্কারের ধারা ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচনে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৫ বছর পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের আশায় যখন দেশের মানুষ মুখিয়ে আছে, তখন ইসলামী আন্দোলনের এই ‘একলা চলো’ নীতি ১৯০৫ পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলনের মতোই এক নতুন স্বকীয়তার বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ইসলামী আন্দোলনের এই প্রস্থান জোটের শক্তিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে যেসব আসনে ইসলামী আন্দোলনের বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে, সেখানে জোটের প্রার্থীদের জয়লাভ করা কঠিন হতে পারে। তবে জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, তারা এখনও সমঝোতার পথ খোলা রাখতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি প্রমাণ করবে কোন দল কতটুকু জনপ্রিয় এবং কার আদর্শিক ভিত্তি কতটা মজবুত। ১৯০০ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশের রাজনীতি বারবার নতুন রূপ নিয়েছে, এবং এবারের এই জোট ভাঙার ঘটনা সেই ইতিহাসেরই একটি অংশ।
তথ্যসূত্র: ১. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন (১৬ জানুয়ারি, ২০২৬)। ২. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের প্রেস ব্রিফিং (১৬ জানুয়ারি, ২০২৬)। ৩. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও ২০২৬ সংসদ নির্বাচন বিষয়ক ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক প্রতিবেদন।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |