প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। ১৯৫০-এর দশকে যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান তাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও ভারত গমনের পর দেশ যখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবমান, ঠিক তখনই ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন দলীয় নেতার ঘরে ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির আগামীর ভাগ্যলিপি নির্ধারণের এক নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ধাপে এদেশের মানুষ এক একজন মহানায়কের ওপর আস্থা রেখেছে। ১৯৫০-এর দশকের সেই ত্যাগী রাজনীতির ধারা ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয় এনে দিয়েছিল। কিন্তু গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ন্যারেটিভ পলিটিক্স’ বা বয়ান তৈরির রাজনীতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
তারেক রহমান সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচাইতে বেশি ‘জাজমেন্টের’ শিকার হওয়া চরিত্র। ক্ষমতায় বসার আগেই তাঁকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিপুল অর্থ ও মেধা ব্যয় করা হয়েছে। বামপন্থী বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে মূলধারার মিডিয়া—সবাই মিলে তাঁর এক ‘আন-কালচারড’ ছবি আঁকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের এই ‘পোস্ট-ন্যারেটিভ’ যুগে এসে জেন-জি এবং সাধারণ মানুষ সেই পুরনো প্রোপাগান্ডা প্রত্যাখ্যান করছে।
বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতা মানেই হবে ‘আয়রন ম্যান’ বা হুঙ্কার দেওয়া কোনো চরিত্র। শেখ হাসিনার ‘দানবীয়তাকে’ যেখানে দক্ষতা হিসেবে চালানো হতো, সেখানে তারেক রহমান সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি মৃদুভাষী, বিনয়ী এবং জীবনযাপনে অত্যন্ত সাদামাটা। ইউরোপীয় স্টাইলের এই ‘আটপৌরে’ ব্যক্তিত্বের কারণেই প্রতিপক্ষ তাঁকে দুর্বল মনে করার ভুল করে।
অথচ এই সাদামাটা মানুষটিই গত ১৭ বছর লন্ডনে বসে তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছেন। মিডিয়াতে নিষিদ্ধ থেকেও তিনি যেভাবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছেন, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য এক বিস্ময়। তিনি ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলেন না, বরং নিজের কষ্টের চেয়ে কর্মীদের ত্যাগকে বড় করে দেখেন—যা তাঁকে একজন নির্মোহ নেতায় পরিণত করেছে।
তারেক রহমানকে নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে, তিনি দেশে ফিরবেন না। কিন্তু সব জল্পনা নস্যাৎ করে ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পা রাখেন। এটি তাঁর এক বড় ধরনের ‘মোরাল ভিক্টরি’ বা নৈতিক বিজয়। তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি না করে জাতি গঠনের ডাক দিয়েছেন। ৫ আগস্টের পর তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, “শত্রু যদি আপনার হাতে নিরাপদ না থাকে, তবে বিজয়ের কোনো গৌরব নেই।”
এমনকি যে পত্রিকাগুলো এক সময় তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদ্গার করেছে, তাদের অফিসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তিনিই প্রথম গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল সংকীর্ণ দলীয় নেতা নন, বরং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
তারেক রহমানের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। তিনি দেশকে ‘লন্ডন’ বানানোর আকাশকুসুম স্বপ্ন না দেখিয়ে বাস্তবমুখী সংস্কারের কথা বলছেন। তাঁর ‘৩১ দফা’ সংস্কার কর্মসূচি আজ সর্বজনস্বীকৃত। তবে তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলের ভেতরে থাকা সুবিধাবাদী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে এক মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
২০২৫ সালের এই নতুন বাংলাদেশে তারেক রহমান কি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন? অভিজ্ঞ রাজনীতি বনাম তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার যে মেলবন্ধন তিনি তৈরি করার চেষ্টা করছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্য। বিএনপি নেতা হিসেবে তিনি সফল, কিন্তু জাতীয় নেতা হিসেবে তাঁর আসল লড়াইটা শুরু হলো এখন।
সূত্র: ১. ‘Tarique Rahman Returns: What Kind of Leader Will He Be in a Fractured Bangladesh?’ – thewire.in (ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫)। ২. বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ‘জবান’ সম্পাদকের কলাম। ৩. বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও নির্বাচন কমিশন আর্কাইভ (১৯৫০-২০২৫)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |