| বঙ্গাব্দ

পুলিৎজার জয়ী পার্সিভাল এভারেটের ‘জেমস’: সাহিত্যের শেকল ভাঙা এক আখ্যান

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 16-12-2025 ইং
  • 3096375 বার পঠিত
পুলিৎজার জয়ী পার্সিভাল এভারেটের ‘জেমস’: সাহিত্যের শেকল ভাঙা এক আখ্যান
ছবির ক্যাপশন: পুলিৎজার জয়ী পার্সিভাল এভারেটের ‘জেমস

সাহিত্যের নতুন ইতিহাস: পুলিৎজার জয়ী ‘জেমস’ ও শেকল ভাঙা ভাষার জয়গান

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে যখন দীর্ঘশ্বাসের কালিতে রচিত হচ্ছে মানুষের হাহাকার, যখন হৃদয়ের ক্ষরিত রক্তে সিক্ত প্রতিটি জনপদ—ঠিক তখন সাহিত্যের আঙিনা থেকে এলো এক মুক্তির বার্তা। পার্সিভাল এভারেটের উপন্যাস ‘জেমস’ ২০২৫ সালের পুলিৎজার পুরস্কার জয় করে আমেরিকান সাহিত্যে এক নতুন যুগান্তকারী মুহূর্ত তৈরি করেছে। মার্ক টোয়েনের কালজয়ী ‘হাকলবেরি ফিন’-এর সেই চিরচেনা অথচ আড়ালে থাকা চরিত্র ‘জিম’কে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস কেবল একটি ক্লাসিকের পুনর্কথন নয়; বরং এটি বর্ণবাদী অতীতের এক সাহসী ব্যবচ্ছেদ।

১৯৫০-২০২৫: এক সংগ্রামের নিরন্তর স্রোত

১৯৫০-এর দশকে যখন বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই তীব্র হচ্ছিল, ঠিক তখন থেকেই সাহিত্যেও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর জোরালো করার দাবি ওঠে। ১৯৫২ সালে বাংলাদেশে যেমন ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতি নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিল, ২০২৫ সালে এসে পার্সিভাল এভারেট ঠিক একইভাবে ভাষার মাধ্যমেই ‘জেমস’-এর পরিচয় পুনরুদ্ধার করেছেন।

পুলিৎজার জুরিদের মতে, "এই উপন্যাস শেকলভাঙা ভাষার শক্তি দিয়ে আমেরিকান সাহিত্যকে আবার সংজ্ঞায়িত করেছে।" এটি ১৯৫০-এর দশকের সেই নাগরিক অধিকার আন্দোলনের চেতনারই এক আধুনিক প্রতিফলন, যা জর্জ ফ্লয়েডের পরবর্তী যুগে এসে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের প্রতিধ্বনি হয়ে ধরা দিয়েছে।

হাক ফিনের জিম থেকে এভারেটের জেমস: এক রূপান্তর

মার্ক টোয়েনের মূল উপন্যাসে ‘জিম’ চরিত্রটি ছিল অনেকটা সরল এবং বর্ণবাদী স্টেরিওটাইপের শিকার। কিন্তু এভারেট সেই জিমকে দিয়েছেন এক জটিল মনস্তত্ত্ব ও তীব্র বুদ্ধিবৃত্তি। মিসিসিপি নদীর তীরে দাসপ্রথার যুগে জেমস (জিম) কেবল হাক ফিনের সহযাত্রী নয়, সে নিজেই নিজের গল্পের নায়ক।

১৯৫০ থেকে ২০২৫ সালের এই দীর্ঘ সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্রদের চিত্রায়ন যেভাবে বিবর্তিত হয়েছে, ‘জেমস’ তার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এখানে জেমস গোপনে পড়তে শিখেছে, সে লাতিন ও দর্শন জানে। কিন্তু সাদা সমাজের সামনে সে ‘মূর্খ’ সাজে—কেবল আত্মরক্ষার কৌশলে। এভারেট যেন মেকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’-এর সেই কৌশলী রূপকেই জেমসকে সাজিয়েছেন, যেখানে শত্রুর প্রত্যাশাকে ফাঁকি দেওয়াই হলো শক্তি।

ভাষার রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ঘোষণাপত্র

উপন্যাসের শিরোনামেই এভারেটের বিদ্রোহ সুস্পষ্ট। ‘জিম’ নামটি যেখানে বর্ণবাদী অবজ্ঞার প্রতীক, সেখানে ‘জেমস’ নামটি শ্রদ্ধা ও পূর্ণ ব্যক্তিত্বের দাবিদার। উপন্যাসে একটি দৃশ্য রয়েছে যেখানে জেমস শেক্সপিয়ার উদ্ধৃত করে এক দাস ব্যবসায়ীকে বিভ্রান্ত করে দেন—যা প্রমাণ করে সাহিত্য-জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট জাতির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

এভারেটের ভাষ্যে : "সাদা মানুষরা ভাবে আমরা বুঝি না কমা-সেমিকোলনের খেলা। তারা জানে না, আমরা তাদের চেয়ে ভালো জানি কীভাবে শব্দ দিয়ে ফাঁদ পাতা যায়।" এই দ্বৈত ভাষা ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া ‘নিগ্রো ভয়েস’-এর প্রতিনিধিত্বের সেই দীর্ঘ লড়াইকে পূর্ণতা দিয়েছে।

সাফল্যের শিখরে ‘জেমস’

পুলিৎজার জয়ের আগে ২০২৪ সালে ‘জেমস’ ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, কার্নেগি মেডেল ফর ফিকশন এবং কিরকাস প্রাইজ অর্জন করে। এটি বুকার প্রাইজের জন্যও মনোনীত হয়েছিল। ইতোমধ্যে স্টিভেন স্পিলবার্গের নির্বাহী প্রযোজনায় ইউনিভার্সাল পিকচার্স এই উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপান্তরের অধিকার অধিগ্রহণ করেছে।

বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘জেমস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বর্ণবাদের ভূত আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি। এটি অতীতের অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বর্তমানকে আলোকিত করার এক প্রচেষ্টা। যেমনটি জেমস তার উপন্যাসের শেষ লাইনে বলেন— "আমার গল্প শেষ হয়নি। কারণ মুক্তির গল্প কখনো শেষ হয় না।" ১৯৫০-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ২০২৪-২৫-এর গণঅভ্যুত্থান—সর্বত্রই যেন এই ‘মুক্তি’ এবং ‘পরিচয়’ রক্ষার নিরন্তর সংলাপ ধ্বনিত হচ্ছে।


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংবাদ সংস্থা।


বিশ্লেষণ: পার্সিভাল এভারেট শুধু একটি চরিত্রকে পুনরুজ্জীবিত করেননি; তিনি সাহিত্যের ইতিহাসকে একটি নৈতিক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এই উপন্যাসটি আগামী প্রজন্মের পাঠক ও সমালোচকদের কাছে মানবিক মর্যাদার এক বলিষ্ঠ ঘোষণা হিসেবে টিকে থাকবে। ২০২৫ সালের এই পুলিৎজার জয়টি মূলত ইতিহাসের সেই খণ্ডিত কণ্ঠগুলোকে জোড়া লাগানোর এক বিজয়।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency