অনলাইন টিকিট ব্যবসায় ভয়াবহ জালিয়াতি: বন্ধ ‘ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল’, নিঃস্ব হাজারো গ্রাহক
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেশে অনলাইন উড়োজাহাজ টিকিট বুকিং খাতে বারবার জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ বড় আকারে প্রতারণার শিকার হয়েছেন হাজারো ক্রেতা ও সাব-এজেন্ট, যখন ‘ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল’ নামের জনপ্রিয় অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়।
বুধবার হুট করে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও অফিস বন্ধ হয়ে গেলে ক্ষুব্ধ গ্রাহক ও এজেন্টরা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার রোড ক-৯/এ-র হাজি আব্দুল লতিফ ম্যানশন-এর সামনে জড়ো হন।
সেখানকার অফিসে তালা ঝুলছে, বন্ধ সব ফোন নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট।
ঢাকার গ্রাহক জসিম উদ্দিন বলেন,
“গতকাল টিকিট কেটেছি, অনলাইনে টাকা দিয়েছি। আজ সকাল থেকে ফোন ধরছে না, অফিসে গিয়ে দেখি তালা। এখন আমি নিঃস্ব।”
সাব-এজেন্ট স্বপ্ন গ্লোবাল-এর মালিক শৈশব মাহমুদ জানান,
“সাড়ে চার লাখ টাকার টিকিট ইস্যু করেছিলাম। সব টাকা ফ্লাই ফারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছি। এখন অফিস বন্ধ, ফোন বন্ধ, আর টিকিট বাতিল।”
প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় নারী ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম “ফ্লাই ফার লেডিস”-এর গ্রাহকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভুক্তভোগী আলেয়া আফরিন জানান,
“দুবাই প্যাকেজের জন্য ৩.৫ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। বলা হয়েছিল টিকিট ও হোটেল বুকিং সাত দিন আগে দেওয়া হবে। এখন ফোন বন্ধ, কেউ যোগাযোগ করছে না।”
তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের প্রায় ১০-১২ হাজার সাব-এজেন্ট ছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের আইএটিএ (IATA) কোড ৪২৩৩৯৮৮৩ ব্যবহার ছাড়াও ভেলেন্সিয়া, ডাইনামিক ট্রাভেলসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কোডে টিকিট ইস্যু করত।
নির্ধারিত আইএটিএ পরিশোধ না করায় সেই সব অ্যাকাউন্ট থেকে গ্রাহকের টিকিট রিফান্ড হয়ে যায়। অর্থাৎ, টিকিট বাতিল হলেও টাকা ফেরত পাননি কেউ।
৮০০-এরও বেশি সাব-এজেন্সি বৃহস্পতিবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়—ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল সরাসরি টিকিট ইস্যু না করে অন্য এজেন্সির নামে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
এটি প্রথম নয়—গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি একই পদ্ধতিতে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
| সাল | কোম্পানির নাম | প্রতারণার পরিমাণ | অবস্থা |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ২৪টিকিট ডটকম | প্রায় ৪.৪৪ কোটি টাকা | কোম্পানি উধাও |
| ২০২৩ | লেটস ফ্লাই | ১০ কোটি টাকার প্রতারণা | এমডি পলাতক |
| ২০২৫ (আগস্ট) | ফ্লাইট এক্সপার্ট | অজানা পরিমাণ | এমডি সালমান বিন রাশিদ দেশত্যাগ |
| ২০২৫ (অক্টোবর) | ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল | কয়েকশ কোটি টাকার জালিয়াতি সন্দেহ | কার্যক্রম বন্ধ |
বর্তমানে দেশে ৪০-৪৫টি ওটিএ (Online Travel Agency) থাকলেও সক্রিয় মাত্র ৫-৭টি। বাকিগুলো কেবল ওয়েবসাইট-নির্ভর বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফ বলেন,
“এসব প্রতিষ্ঠান কেবল টিকিট বিক্রি করে না, মানি ম্যানেজমেন্টের নামে বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করে। এতে বিদেশে অর্থ পাচারের পথ তৈরি হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন,
“আমরা বহুবার ওটিএ নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছি, কিন্তু অজানা কারণে তা হয়নি। ফলে প্রতারকরা সহজেই পালিয়ে যাচ্ছে।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“বারবার প্রতারণা হওয়া সত্ত্বেও সরকার, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সমন্বিত নীতি নেই—এটা অগ্রহণযোগ্য। এর সুযোগে কিছু মালিক মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলছে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও আটাবের প্রশাসক মোতাকাব্বির আহমেদ বলেন,
“এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
ওটিএ নীতিমালা ও লাইসেন্স ব্যবস্থা দ্রুত প্রণয়ন জরুরি।
টিকিট বিক্রির সব লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষা আওতায় আনতে হবে।
ডিজিটাল ট্রাভেল পোর্টালগুলোর রেজিস্ট্রেশন ও ডেটা অডিট বাধ্যতামূলক করা দরকার।
প্রতারিত গ্রাহকদের জন্য একটি অনলাইন ক্ষতিপূরণ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে অনলাইন টিকিট বিক্রির বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। কিন্তু সঠিক নীতিমালা ও তদারকি না থাকায় এই সেক্টরটি এখন প্রতারকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। “ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল”-এর পতন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়—এটি নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা ও গ্রাহক সুরক্ষাহীনতার করুণ উদাহরণ।
যদি এখনই কঠোর নীতি ও আর্থিক নজরদারি না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এই সেক্টরে আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
Jugantor Online, “ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল বন্ধ, বিপাকে হাজারো গ্রাহক”, ১৮ অক্টোবর ২০২৫।
The Business Standard, “Online air ticket frauds rise amid lack of OTA policy”, অক্টোবর ২০২৫।
TIB Statement on Travel Agency Scams, ২০২৫।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |